সংবাদ শিরোনাম

এই যেন অন্যরকম সাংগ্রাঁইঃ কাপ্তাইয়ের চিৎমরমে নেই কোন কোলাহল

চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার মাঠ, যেখানে বসতো বৈশাখী মেলা। বুধবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ১০ টায় তোলা ছবি।

 

ঝুলন দত্ত, কাপ্তাই ( রাঙামাটি)

রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরমে রয়েছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার। প্রতিবছর বাংলা নববর্ষ আসলে এখানে বসতো ৩-৪ দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। হতো মারমা সম্প্রদায়ের বৃহত্তম সামাজিক উৎসব সাংগ্রাঁই জলকেলী উৎসব। উৎসবকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার দায়ক দায়িকা সহ নানা ধর্মের মানুষের মিলন মেলা বসতো চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার মাঠে। থাকতো ঐতিহ্যবাহী মারমা সম্প্রদায়ের নাচ,গান, খেলাধূলা সহ নানা আয়োজন। মহামারি করোনার কারনে সাংগ্রাঁই এইবছর যেন চিৎমরমবাসীর কাছে এসেছে অন্যরুপে। বিগত বছরেও করোনার কারনে এই উৎসব বাতিল করতে হয়েছে আয়োজক কমিটির। তাদের আশা ছিলো এইবছরও ধুমধামে পালন করবে এই উৎসব। কিন্ত করোনা সংক্রমনের উদ্ধমুখীর কারনে এইবারও ঘরোয়া ভাবে পালিত হচ্ছে সাংগ্রাঁই জল উৎসব।
বুধবার ( ১৪ এপ্রিল) সকালে চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার মাঠে গিয়ে দেখা যায়, সুনসান নীরবতা, নেই কোন দোকান, নেই কোন মানুষের সমাগম, অথচ প্রতিবছর ১৩ এপ্রিল হতে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত এই মাঠে বসতো বৈশাখী মেলা। হরেক রকম পণ্য নিয়ে ব্যবসায়ীরা দূর দূরান্ত হতে আসতো এই মেলায় বেচাকেনা করতে। তবে চিৎমরম বৌদ্ধ বিহারে স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকজন সকাল হতে বুদ্ধ মূর্তিকে স্নান করানো, বুদ্ধ পুজা, পূজনীয় ভিক্ষু সংঘকে পিন্ডদান সহ নানা ধর্মীয় আচার আচরণ পালন করে আসছেন।
কথা হয় সাংগ্রাঁই জলকেলী উদযাপন কমিটি ২০২১ এর আহবায়ক ক্যাপ্রু চৌধুরীর সাথে, তিনি জানান সকল প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম আমরা এই বছর ধুমধামে পালন করবো এই উৎসব। কিন্ত সরকারি নির্দেশনাকে সম্মান জানিয়ে আমরা সকল আনুষ্ঠানিকতা বাতিল করেছি।
মারমা সংস্কৃতি সংস্থা ( মাসস) কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক চিৎমরম এর বাসিন্দা মংসুইপ্রু মারমা জানান, সাংগ্রাঁই মানে উৎসব, সাংগ্রাঁই মানে সকল সম্প্রদায়ের মিলন মেলা, কিন্ত করোনার কারনে আমরা আজ ঘরে বসে পরিবার পরিজন নিয়ে এবং কিয়াং এ গিয়ে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে এই বছর সাংগ্রাঁই পালন করছি।
চিৎমরম এর বাসিন্দা বেতার শিল্পি রফিক আশেকী জানান, সাংগ্রাঁই মূলত মারমা সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও আমরা সকল সম্প্রদায়ের লোকজন এই উৎসবে অংশ নিতাম।

মারমা জনগোষ্ঠী বর্ষবরণের এই উৎসব কে পালন করেন সাংগ্রাঁই নামে। এ উৎসব চলে ৩ দিন ধরে। মারমাগণ সবাই বুদ্ধের ছবি সহকারে নদীর তীরে যান এবং দুধ কিংবা চন্দন কাঠের জল দিয়ে এ ছবিটিকে স্নান করান। তারপর আবার এই ছবিটিকে আগের জায়গায় অর্থাৎ মন্দির বা ঘর বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মারমা সম্প্রদায় সেই আদিকাল থেকে অন্যান্য সম্প্রদায় থেকে ভিন্ন আঙ্গিকে পুরনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরের আগমনকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালন করে আসছে, যা মারমা ভাষায় সাংগ্রাঁই নামে পরিচিত। মূলত ‘সাক্রাই’ (সাল) শব্দ থেকেই ‘সাংগ্রাঁই’ শব্দ এসেছে বলে ধারণা করা হয়। যা বাংলাই ‘সংক্রান্তি’ বলে পরিচিত। মারমা সম্প্রদায়ের ‘সাংগ্রাই জ্যা’র (মারমা বর্ষপঞ্জি) গঠনের মাধ্যমে সাংগ্রাঁইয়ের দিন ঠিক করা হয়ে থাকে। মাইংমা ১৩৫৯ খ্রিষ্টাব্দের আগে থেকেই এ ‘সাক্রাই’ বা সাল গণনা করা হয়, যা ‘জ্যা সাক্রই’ নামে পরিচিত।

সাংগ্রাইয়ের উৎপত্তি নিয়ে মারমা ভাষায় বিভিন্ন কল্পকাহিনী বিদ্যমান রয়েছে, যা এখনো মারমা বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে মুখে প্রচলিত। কবে থেকে মারমাদের সাংগ্রাঁই উদ্যাপন শুরু হয় এ ব্যাপারে সঠিক কোনো ইতিহাস এখনো পাওয়া যায়নি। সাংগ্রাঁই উৎসবটি মারমারা তিন দিনব্যাপী উদ্যাপন করে। সাংগ্রাইঁয়ের প্রথম দিন( ১৩ এপ্রিল) মারমা ভাষায় ‘সাংগ্রাই আক্যা’ বা ‘পাইং দোয়াক’ (সাংগ্রাইয়ের প্রথম দিন পুষ্প আহরণ), এই দিন ঘরে ঘরে পুষ্প দিয়ে সাজানো হয়, অনেক বয়স্করা উপবাস থাকেন,কিয়াং এ রাত্রিযাপন করেন । দ্বিতীয় দিন মূল সাংগ্রাঁই বা ‘সাংগ্রাই বাক্’ (সাংগ্রাইয়ের দিন) এদিন বিহারে গিয়ে বুদ্ধ পুজা, বুদ্ধ মূর্তিকে ম্নান এবং বয়স্কদের স্নান করানো হয়, উৎসব এর তৃতীয় দিন(১৫ এপ্রিল) ‘সাংগ্রাই আপ্যাইং’ (সাংগ্রাই বিদায়) নামে পরিচিত। এই তিন দিন মারমারা নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করে।

করোনা মুক্ত হয়ে আবারোও সাংগ্রাঁই আসুক আনন্দের বারতা নিয়ে সকলের এই প্রত্যাশা।